পুঠিয়া রাজবাড়ির ইতিহাস

রাজশাহীতে তথা বরেন্দ্রভূমিতে রয়েছে অসংখ্য হেরিটেজ সাইট। আপনি যদি ঐতিহাসিক স্থাপনা দেখতে পছন্দ করেন তাহলে একবার রাজশাহী ঘুরে আসতে পারেন। এতে করে আপনার শিল্পমনা মনের অনেকটা খোরাক পাবেন এটুকু বলতে পারি।

আমাদের আজকের পোস্টের আলোচ্য বিষয় পুঠিয়া রাজবাড়ির ইতিহাস। অতীতে রাজ-রাজারা নিজেদের বাসস্থানের জন্য বড় বড় ইমারত ও নান্দনিক কারুকাজ এবং ডিজাইনে তৈরি করতেন রাজপ্রাসাদ।

পোস্ট সূচিপত্রঃ পুঠিয়া রাজবাড়ির ইতিহাস

পুঠিয়া রাজবাড়ি কোথায়

পুঠিয়া রাজবাড়ির ইতিহাস জানতে গেলে প্রথমেই জানতে হবে পুঠিয়া রাজবাড়ি কোথায়। পুঠিয়া রাজবাড়ি রাজশাহী মূল শহর থেকে প্রায় ত্রিশ কিলোমিটার পূর্ব দিকে অবস্থিত। রাজশাহী-নাটোর মহাসড়ক থেকে মাত্র এক কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত পুঠিয়া রাজবাড়ি।

পুঠিয়া বাজারের দক্ষিণ পাশে দ্বিতল বিশিষ্ট আয়তাকার রাজবাড়িটির প্রবেশ পথ উত্তরদিকে অবস্থিত।

পুঠিয়া রাজবাড়ির ইতিহাস

পুঠিয়া রাজবাড়ির ইতিহাস বহু পুরাতন পুঠিয়া রাজবাড়ি থেকে তখনকার রাজ রাজারা তাদের রাজ্য পরিচালনা করতেন। দোষী সাব্যস্ত অপরাধীদের শাস্তি দেয়ার জন্য একটি কারাগার ছিল এই জমিদার বাড়িতে। সেই সাথে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য জমিদার বাড়ির চারপাশে পরীক্ষা খনন করা হয় যেগুলো এখন বিভিন্ন নামে পরিচিত।

আরও পড়ুনঃ জাম খেলে কি উপকার হয়

এই দেখি গুলোর নাম হল শিবসাগর, গোপাল চৌকি, বেকিচৌকি, মরাচৌকি। এছাড়া এ জমিদারবাড়ির মাঝখানে রয়েছে শ্যামসাগর নামে একটি বড় পুকুর। পরীক্ষা বেষ্টিত জমিদার বাড়ির স্থলভাগের আয়তন ছিল ২৫.৯৩ একর। যা জমিদারবাড়ির মাঝের শ্যামসাগর এর আয়তন বাদ দিয়ে গণনা করা হয়।

রাজ বাড়ির আশেপাশে এখানকার জমিদারদের নির্মিত বেশ কয়েকটি মন্দির এখনো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। সরিক বিভাজন হবার পর পাঁচানি জমিদার বাড়ি এবং চার আনি জমিদার বাড়ি ছাড়া অন্যকোন সরিকের বাড়িঘরের কোন চিহ্ন পাওয়া যায়না।

পুঠিয়া জমিদার বাড়ি আশেপাশে এখনো প্রায় ১৪ টি মন্দিরের দেখা মেলে। মন্দির গুলোর মধ্যে দুটি পঞ্চরত্ন, একটি দোচালা, একই রয়েছে মিশ্র রীতির ত্রি মন্দির। একটি অষ্টকোণা একরত্ন। দুটি সমতল ছাদ বিশিষ্ট এবং বাকিগুলো পিরামিড আকৃতির চৌচালা ছাদবিশিষ্ট।

এ মন্দিরগুলো অধিকাংশই নির্মিত হয়েছে চুন সুরকি তারা তবে লক্ষ্য করা যায় মন্দিরের গায়ে হিন্দু ধর্মীয় কাহিনী এবং সেই সময়ের সামাজিক প্রেক্ষাপট নিয়ে অতি সূক্ষ্ম টেরাকোটার টালি বসানো আছে।

পুঠিয়া রাজবাড়ির ইতিহাস | পুঠিয়া বড় আহ্নিক মন্দির

পুঠিয়া রাজবাড়ির পশ্চিমদিকে রয়েছে একটি বড় দিঘী সেই দিঘী থেকে ১০০ মিটার পশ্চিম দিকে রয়েছে ৩টি মন্দির পাশাপাশি। এর মধ্যে দক্ষিণ দিকে যে মন্দিরটি রয়েছে পূর্ব দিকে মুখ করে সেই মন্দিরটিকে চারানী বড় আহ্নিক মন্দির বলা হয়।

এই মন্দিরটি দেখতে অসাধারণ কারুকার্যময়। এ মন্দিরে তিনটি কক্ষ রয়েছে এর প্রবেশ পথ পূর্বদিকে অবস্থিত। এই মন্দিরের পূর্বদিকে প্রবেশপথের পাশে রয়েছে নিপুন হাতে তৈরি হিন্দু ধর্মীয় কাহিনী এবং তৎকালীন সামাজিক প্রেক্ষাপট নিয়ে সূক্ষ্ম কিছু টেরাকোটার কাজ। যা দেখলে সেই সময়ের শিল্পীদের নৈপুন্যতা সম্পর্কে আপনার ধারণা বদলে যাবে।

পুঠিয়া রাজবাড়ির ইতিহাস | পুঠিয়া বড় শিব মন্দির

১৮২৩ সালে পাঁচআনি জমিদার বাড়ির রানী ভুবনময়ী দেবী এই মন্দিরটি নির্মাণ করেন। তার নাম অনুসারে এই মন্দিরকে ভুবনেশ্বর মন্দির বলেও ডাকা হয়।

আরও পড়ুনঃ কবরের আজাব থেকে মুক্তির উপায়

পুঠিয়া বাজার ঢুকতেই হাতের বাম পাশে পুকুরের দক্ষিণ পাশে পুঠিয়া বড় শিব মন্দির অবস্থিত। এই শিব মন্দিরটি একটি উঁচু বাঁধের উপরে অবস্থিত। শিব মন্দিরের কেন্দ্রীয় চূড়ার চারদিকে রয়েছে চারটি ছোট চূড়া। এই মন্দিরের প্রবেশ পথ দক্ষিণ দিকে। মন্দিরের গায়ে রয়েছে বেশকিছু নান্দনিক শিল্পকর্ম যেগুলো প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে।

জানা যায় এই শিবমন্দিরটিতে দেশের সবচেয়ে বড় শিবলিঙ্গ অবস্থিত। এখনো এই মন্দিরটিতে প্রতিদিন পূজা-অর্চনা করা হয়। দৃষ্টিনন্দন এই মন্দিরটি পুঠিয়া রাজবাড়ির মন্দির গুলোর মধ্যে অন্যতম সেরা একটি মন্দির।

পুঠিয়া রাজবাড়ির ইতিহাস | পুঠিয়া দোল মন্দির

ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে পাচানি জমিদার বাড়ির হেমন্ত কুমারী দেবী পুঠিয়া দোল মন্দির নির্মাণ করেন। পুঠিয়া রাজবাড়ির ইতিহাস অনেক বেশি সমৃদ্ধ করতে কম ভূমিকা নেই পুঠিয়া দোল মন্দির এর।

এই মন্দিরটি ক্রমশ থাকে থাকে উপরের দিকে ছোট হয়েছে। রয়েছে একটি গম্বুজ। দোল মন্দিরের নিচের স্তরে প্রত্যেক বাহুতে রয়েছে সাতটি দরজা, দ্বিতীয় তলায় প্রত্যেক বাহুতে পাঁচটি করে দরজা, তৃতীয় তলায় প্রত্যেক বাহুতে তিনটি করে দরজা এবং চতুর্থ তলায় প্রত্যেক বাহুতে রয়েছে একটি করে দরজা।

ভূমি থেকেই মন্দিরটির উচ্চতা প্রায় ২০ মিটার। চারতলা বিশিষ্ট এই মন্দির প্রত্যেক বাহুর পরিমাপ প্রায় ২১.৫৪ মিটার। যার ফলে এই মন্দিরটি পেয়েছে নান্দনিক একটি রূপ। যা মানুষকে আকৃষ্ট করতে পারে।

পুঠিয়া রাজবাড়ির ইতিহাস | পুঠিয়া গোবিন্দ মন্দির

চোখধাঁধানো পুঠিয়া গোবিন্দ মন্দির অবস্থিত পুঠিয়া রাজবাড়ির অঙ্গনে। ধারণা করা হয় আঠারো শতকের দিকেই মন্দির নির্মিত হয়েছে। তবে সেই সময়ের শিল্পীরা কত বেশি দক্ষ এবং সুনিপুণভাবে নিজেদের শিল্পকর্ম তৈরি করতেন এই মন্দিরের টেরাকোটা গুলো দেখলে তার প্রমাণ পাওয়া যায়।

আরও পড়ুনঃ সয়াবিন তেলের উপকারিতা ও অপকারিতা

কিছুটা উঁচু বেদীর উপরে এই মন্দিরটি অবস্থিত এই মন্দিরটির বিশেষত্ব হলো এর চারিদিকে রয়েছে অসংখ্য টেরাকোটায় হিন্দু ধর্মের নানা কাহিনী সেই সাথে রয়েছে তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থার যুদ্ধবিগ্রহ থেকে সামাজিক অনেক কাহিনী সংবলিত টেরাকোটা। যা এই মন্দিরটি সৌন্দর্য বহুগুণে বৃদ্ধি করেছে।

মন্দিরটির চারিদিকে আরো কয়েকটি মন্দির ছিল যেগুলো প্রাপ্ত হয়েছে। ইমন তৃপ্তির পেছনেই রয়েছে রানী ঘাট যেখানে প্রাণীরা গোসল করতেন সখীদের নিয়ে।

পুঠিয়া রাজবাড়ির ইতিহাস | পুঠিয়া রাণী ঘাট

পুঠিয়া রাজবাড়ির ইতিহাসে এর একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হলো রাণিঘাট। এই জায়গাটিতে অনেকেই গিয়ে থাকবেন। এই জায়গাতে গেলে আপনার মনে হবে এই বুঝি রাণী তাঁর সাত সখিদের নিয়ে এখানে গোসল করতে আসবেন। 

ভাবলে অবাক হতে পারেন সেই সময়ে সুন্দর করে রাণিডেড় জোণয় গশোল খাণা তৈরি করা হয়েছিল। কিছু সময়ের জন্য আপনি হারিয়ে যেতে পারেন ইতিহাসের সেই রোমান্সপূর্ণ সময়ে যখন বৃষতির দিনে রাণী এবং তাঁর সখিরা একসাথে এই জায়গাতে খেলা করতেন।

পুঠিয়া রাজবাড়ি যাওয়ার উপায়

পুঠিয়া রাজবাড়ির ইতিহাস এর চোখে দেখা তেষ্টা হলে হুট করেই কোন একটা সময়ে চলে আসতে ইচ্ছে করতে পারে। তাই জেনে রাখা ভালো কোথায় থেকে কিভাবে গেলে আপনি সহজে যেতে পারবেন।

রাজশাহী শহর থেকে পুঠিয়া রাজবাড়ির দূরত্ব প্রায় ৩০ কিলোমিটার এবং নাটোর শহর থেকে প্রায় ১৮ কিলোমিটার। কাজেই আপনি রাজশাহী থেকে যেতে চাইলে লোকাল বাস বা লেগুনা করে যেতে পারেন এতে আপনার সময় লাগবে পৌনে এক ঘণ্টার মতো।

অন্যদিকে ঢাকা থেকে বা অন্য কোথাও বাসযোগে আসতে চাইলে রাজশাহীর উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাওয়া বাসগুলোতে উঠে পুঠিয়া বাসস্ট্যান্ডে নামতে পারেন সেখান থেকে অটো বা রিক্সা করে খুব সহজেই যেতে পারবেন পুঠিয়া রাজবাড়ি।

আমাদের শেষ কথাঃ পুঠিয়া রাজবাড়ির ইতিহাস

পুঠিয়া রাজবাড়ির ইতিহাস সম্পর্কে বলতে গেলে কখনোই ইতিহাস শেষ করা সম্ভব নয়। সব ইতিহাস জানাও সম্ভব নয়। কালের বিবর্তনে অনেকগুলো মন্দির ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে। যেগুলো আছে সেগুলোর অবস্থাও অনেক করুন।

সম্প্রতি সময়ে পুঠিয়া রাজবাড়িতে একটি যাদুঘর প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। আপনি চাইলে সেখানে গিয়ে অনেক শিল্পকর্ম দেখতে পারবেন। কাজেই ইচ্ছে থাকলে সময় হলে একবার ঘুরে আসতে পারেন পুঠিয়া রাজবাড়ি আঙিনায়। 


এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

fasttechit নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url